তোফােয়েল আহমেদ, নিজস্ব প্রতিনিধি: সরকারের দ্বিচারিতা জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল। একই তফসিলের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও শপথ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে।
আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জুলাই পরিবর্তনোত্তর প্রতিশ্রুত সংস্কারের পথরেখা বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: নাগরিক সমাজের দায়’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করে বলেন, সরকার সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির অপপ্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধীদলের অধিকার খর্ব করছে এবং গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কারসহ জনগুরুত্বপূর্ণ প্রায় ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। বিচার বিভাগকে দলীয়করণের লক্ষ্যে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সিআইপিজির চেয়ারম্যান ড. মোজাম্মেল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাবেক সচিব (অব.) মু. আবদুল কাইয়ূম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন। সেমিনারে বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা সমুন্নত রাখতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ আইন আকারে প্রণয়ন ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সেমিনারে আলোচনা করেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক সিনিয়র সচিব শফি উল্লাহ, সাবেক নৌবাহিনীর কমান্ডার সিদ্দিকুর রহমান, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি সাদিক আহমেদ প্রমুখ।
আলোচনায় এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম ভিত্তি হলো জনগণের অভিপ্রায়, যা জুলাই অভ্যুত্থান ও গণভোটের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। বর্তমান সরকার কার্যক্রমের মাধ্যমে সেই অভিপ্রায়কে উপেক্ষা করছে।
আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার নিজেদের মতো করে আইন পাস করছে এবং ঘোষিত ৩১ দফাও অনুসরণ করছে না। ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিতে আওয়ামী লীগের প্রতিচ্ছবি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে গণভোটে পাস হওয়া সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। তাই গণভোটের আলোকে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তিনি স্বাধীন বিচার বিভাগ ও কার্যকর দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করে এবং গণভোটের আয়োজন করে।
বেলায়েত হোসেন উল্লেখ করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়নি। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে, এর প্রস্তাবগুলো গণভোটে জনগণের সম্মতি পেয়েছে। ফলে এগুলো বাস্তবায়নে সরকার নৈতিক ও আইনিভাবে বাধ্য। তিনি বলেন, সংসদ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়, কারণ সংসদে পাস হওয়া আইন সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জযোগ্য। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।