নেপাল-তিব্বতে বন্যায় নিহত বেড়ে ৭৫০, নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার

আপলোড সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ১১:৫৫:০৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ১১:৫৫:০৮ পূর্বাহ্ন
বাংলা রিলিজ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক :  নেপাল ও তিব্বতে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এখনো নিখোঁজ আছেন আরও প্রায় ৩ হাজার।  আজ রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে নেপাল সরকার সর্বশেষ এ তথ্য জানিয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়ে আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। 
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা ৭৩৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। যেগুলো বন্যাকবলিত বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছে। খবর বিবিসি ও এএফপির।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪২৬ জন। দেশটিতে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চলে সাতজন নিহত এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। দুই অঞ্চলে মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭৬ এবং নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর অন্যতম নুয়াকোটে শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল থেকে আকাশপথে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। তবে দুপুরের আগে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে আসার পর আবারও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজারাম বাসনেত জানান, কিছু হেলিকপ্টারে পোশাক, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, বিস্কুট ও চালসহ ত্রাণসামগ্রী দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়। অন্য হেলিকপ্টারগুলো বন্যাকবলিত এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষদের নিয়ে ফিরে আসে।
ত্রিশুলি এলাকার কাছের একটি জনপদ থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিশু ও প্রবীণও ছিলেন। উদ্ধারকেন্দ্রে আনার পর চিকিৎসকরা তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন।
তবে অনেক বাসিন্দা নিরাপদ স্থানে সরে গেলেও কেউ কেউ আবার নিজেদের বিধ্বস্ত ঘরে ফিরে যাচ্ছেন কী কী উদ্ধার করা সম্ভব তা দেখতে। একজন কিশোরকে কাদামাখা স্যান্ডেল হাতে গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।
শোভা শ্রেষ্ঠা নামে এক নারী বন্যার সময় ফেলে আসা তার কুকুরটিকে খুঁজতে গ্রামে ফিরে যান। কুকুরটিকে খুঁজে পেয়ে তিনি সেটিকে আদর করেন এবং বোতল থেকে পানি পান করান।
এদিকে, কাঠমান্ডুর প্রধান সরকারি হাসপাতালের বাইরে আজ সকাল থেকেই নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। অনেকে হাতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি নিয়ে হাসপাতালের সহায়তা ডেস্ক ও নোটিশ বোর্ড খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
রামেছাপ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নিখোঁজ ভাইয়ের খোঁজে হাসপাতালে এসেছেন দিল মায়া লামা। তার ২৬ বছর বয়সী ভাই রাসুওয়ায় একটি জলবিদ্যুৎ কোম্পানিতে চালক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ‘তাকে খুঁজে পাব—এই আশা নিয়েই এখানে এসেছি। কিন্তু তার কোনো খবর নেই।’
নিখোঁজ এক স্বজনের খোঁজে হাসপাতালে আসা নেলজা মোকতান বলেন, চার দিন পার হয়ে গেলেও কোনো তথ্য না পাওয়ায় আশা হারিয়ে ফেলছি।
হাসপাতালের দেওয়ালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও যোগাযোগ নম্বরসংবলিত পোস্টার টানিয়েছেন স্বজনরা। অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ছবিও টানানো হয়েছে যাতে স্বজন বা পরিচিতরা তাদের শনাক্ত করতে পারেন।
হাসপাতালের সহায়তা ডেস্কে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মকর্তা গজেন্দ্র রাওয়াত জানান, দুর্যোগের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য নিবন্ধন করেছেন স্বজনরা।
নুয়াকোটের একটি ত্রাণকেন্দ্রেও নিখোঁজ ও নিহতদের নামসংবলিত তালিকা টানিয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। স্বজনরা সেখানে ভিড় করে তালিকায় প্রিয়জনের নাম খুঁজছেন।
ছেলের সন্ধানে থাকা রাজেশ কুমার রাম বলেন, ‘আমি আশা করছি, কোনোভাবে আমার ছেলে হয়তো কোথাও আছে। হয়তো সে কোথাও আটকে আছে। আমি শুধু সেই মুহূর্তটির অপেক্ষায় আছি।’
রাসুওয়া জেলার আপার ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত বলেন, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণস্থলের কাদাপূর্ণ সুড়ঙ্গে ১০০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা ঝুড়ি ও দড়ির সাহায্যে কয়েকজনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও সুড়ঙ্গের ভেতরে চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর কাদা এবং হেলিকপ্টার অবতরণের সীমিত জায়গার কারণে অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
বুধবারের প্রাথমিক বন্যার পর হিমালয়ের উঁচু এলাকায় হিমবাহ ধসের ফলে একটি নতুন হ্রদ সৃষ্টি হয়। হ্রদটি উপচে পড়তে শুরু করায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উদ্ধারকর্মীরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।
তবে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ তথ্যের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, শুক্রবার রাত পর্যন্ত হ্রদটির আয়তন কমে এসেছে। বৃহস্পতিবার সকালে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর পানির স্তর প্রায় ১০ মিটার বা ৩২ ফুট নেমেছে।
শনিবার চীনের গিরং সীমান্ত বন্দরে উদ্ধারকারীদের অভিযান চালানোর দৃশ্য দেখানো হয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। উদ্ধারকারীদের কেউ হেঁটে, কেউ ভেলায় এবং কেউ ড্রোনের সহায়তায় দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল শনিবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, নিখোঁজদের সন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সরকারের সব ধরনের সম্পদ মোতায়েন করা হয়েছে। এটাই এখন আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।
দুর্গত অঞ্চলের খাড়া পাহাড় ও সরু গিরিখাতের কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান খানাল। তিনি বলেন, সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার, জীবিতদের শনাক্ত করার প্রযুক্তি, দ্রুত ফরেনসিক ও ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত সহায়তা চেয়েছে নেপাল।
ভারত থেকে ১১ সদস্যের একটি সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী অনুসন্ধান দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং চীন থেকেও একই ধরনের একটি উদ্ধারকারী দল শিগগিরই পৌঁছানোর কথা রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারত থেকে নেপাল ৫৭ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী এসেছে। এছাড়া চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও সহায়তা আসছে।
বন্যায় চারটি জেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নেপালের বাকি অংশ বিদেশি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ও পুরোপুরি প্রবেশযোগ্য রয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক ও প্রকাশক : 

নির্বাহী সম্পাদক : 

বার্তা সম্পাদক : 


অফিস :

অফিস : 

ইমেইল : 

মোবাইল :