তোফােয়েল আহমেদ, নিজস্ব প্রতিনিধি: দেশনেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন আজ শনিবার (১৫ আগস্ট)। গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন এই নেত্রীর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে গোটা জাতি। তাঁর জন্মদিনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পক্ষ থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান ছিলেন।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে তাঁর জন্ম। তাঁদের আদি বাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।
জিয়াউর রহমান বীর উত্তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নেন। এ সময় তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং নেদারল্যান্ডসের রানি জুলিয়ানাসহ বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
বেগম খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে একটি অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে কোনো আসনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি পৃথক আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিনটি আসনেই বিজয়ী হন।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ঢাকাসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়, মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। ঢাকায় নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১৫ আগস্ট শনিবার সকাল ১১টায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে বিএনপি'র সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মিলাদ ও দোয়া মাহফিলগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছর ৩০ ডিসেম্বর অগণিত ভক্ত, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। ওইদিন ভোর ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সেদিন এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সে সময়ের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, এই সংবাদটা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। আমরা এবারও ভেবেছিলাম তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি আজ ভোর ৬টায়, গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক, জাতির অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
মৃত্যুর সময় বেগম খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে ও বিএনপির তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় হাসপাতালে আরও উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিথি। স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এসকান্দার ও তার স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও শেষ সময়ে হাসপাতালে ছিলেন। এছাড়াও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকেরাও উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হার্ট ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল তাঁর।
হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে গত বছর ২৩ নভেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তাঁর চিকিৎসা তদারকি করেন।
আগস্ট মাসের শুরুতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তীতে তা আর সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বেগম খালেদা জিয়া।
রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেফতার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ- এসবও তাঁদের জীবনে অভাবনীয় নয়। বেগম খালেদা জিয়াও চরম পর্যায়ের নির্যাতন সহ্য করেছেন। সহ্য করেছেন স্বামী-সন্তান হারানোর গভীর শোক আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা।
রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় অদম্য কণ্ঠস্বর খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে কয়েক দশকের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। জটিল আর অনিশ্চিত সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের হাল ধরেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।
তাঁর নেতৃত্বে ছিল প্রজ্ঞা আর অবিচল দৃঢ়তার মিশেল; তিনি কখনো কারোও কাছে নত করেননি, কোনো বাধায় পিছু হটেননি। এই আপসহীন মনোভাবই তাঁকে কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর। শত প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল থেকে আপসহীন পথচলাই বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ও দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে নামতে হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিংবা বারবার কারারুদ্ধ হয়েও তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। পাশপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ারও গৌবর অর্জন করেছিলেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য।
১৫ আগস্ট প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের জন্মদিনে শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।
একগুচ্ছ নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে সেই যাত্রার শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশের এক চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন এই চৌকস ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ফের দেশের হাল ধরেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতি গঠনে সচেষ্ট হন তিনি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদত বরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। এই ঘটনা দেশকে এক গভীর নেতৃত্ব সংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেই শূন্যতার মাঝেই রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অভিষেক ঘটে। বলা যায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনীতির এক অচেনা জগতে পা রেখেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী গৃহবধূ খালেদা জিয়া।
তিনি এমন এক সংকটময় সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, যখন দলটির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই যেন শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানেই ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদত বরণের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এমনকি তিনি বিএনপিকে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিএনপির দায়িত্ব নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল জনসভায় বেগম জিয়া প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হন, যা দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। একই বছরের ২৮ অক্টোবর তিনি দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল ‘বাংলাদেশ সচিবালয়’ ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। যদিও পুলিশ সেই আন্দোলন দমন করে। এই ঘটনার পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি রাজপথে সাত-দলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ ধর্মঘট, ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি, ‘গণপ্রতিরোধ দিবস’ এবং ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর মতো ধারাবাহিক কর্মসূচিতেও নেতৃত্বেও সারিতে ছিলেন এই মহিয়সী নেত্রী। ফলশ্রুতিতে ১৯৮৫ সালে বেগম জিয়াকে আবারও গৃহবন্দী করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত-দলীয় জোট এবং অন্য জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলনের মুখে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী পাঁচ-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আরও ছয়টি দল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। অপরদিকে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।
১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ সরকার তাঁকে ফের গৃহবন্দী করে। ব্যাপক কারচুপির ওই নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটের পর বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর আন্দোলনরত প্রধান তিন রাজনৈতিক জোটের সর্বসম্মত প্রস্তাব ও যৌথ রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের সরকার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। এতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সংসদ সংবিধান সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালের সরকারকে মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সময়কাল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এ সময় সরকার বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে। নারী শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তি উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়াত এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ক্ষমতার পালাবদল
১৯৯৬ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় নির্বাচিত হলেও তাদের মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগ রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বেগম জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বিজয়ী হলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করে সরকার পরিচালনা করেন।
সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে, যা ‘১/১১’ নামে পরিচিত। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করতে বাধ্য করে। পরবর্তী দুই বছর দেশ পরিচালনা করে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার।
এই সরকার বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠায়, তাঁর বড় ছেলে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লন্ডনে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসনে পাঠায়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড ও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ওই সময়ে বেগম জিয়াকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা এবং বিদেশে তাঁর কোনো দ্বিতীয় কোনো বাড়ি নেই।
এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চরম মাত্রার দমন-পীড়ন সহ্য করেন। কিন্তু কারও কাছে মাথা নত করেননি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথে আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলোর সংসদ বয়কটের মুখে তাঁর নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে।
কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর সংসদে তা বাতিল করে। অথচ এর আগে এই ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগই মরিয়া আন্দোলন করেছিল। বেগম জিয়া এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের চর্চা নষ্ট হয়েছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ বছরের সরকারের সময়ে বেগম জিয়া কঠোর দমন-পীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ছিল সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে।
বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হয়রানির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম হয়।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বড় জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানায় দেশের অগণিত জনগণ।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান ছিলেন।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে তাঁর জন্ম। তাঁদের আদি বাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।
জিয়াউর রহমান বীর উত্তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নেন। এ সময় তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং নেদারল্যান্ডসের রানি জুলিয়ানাসহ বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
বেগম খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে একটি অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে কোনো আসনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি পৃথক আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিনটি আসনেই বিজয়ী হন।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ঢাকাসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়, মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। ঢাকায় নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১৫ আগস্ট শনিবার সকাল ১১টায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে বিএনপি'র সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মিলাদ ও দোয়া মাহফিলগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছর ৩০ ডিসেম্বর অগণিত ভক্ত, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। ওইদিন ভোর ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সেদিন এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সে সময়ের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, এই সংবাদটা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। আমরা এবারও ভেবেছিলাম তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি আজ ভোর ৬টায়, গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক, জাতির অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
মৃত্যুর সময় বেগম খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে ও বিএনপির তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় হাসপাতালে আরও উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিথি। স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এসকান্দার ও তার স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও শেষ সময়ে হাসপাতালে ছিলেন। এছাড়াও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকেরাও উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হার্ট ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল তাঁর।
হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে গত বছর ২৩ নভেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তাঁর চিকিৎসা তদারকি করেন।
আগস্ট মাসের শুরুতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তীতে তা আর সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বেগম খালেদা জিয়া।
রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেফতার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ- এসবও তাঁদের জীবনে অভাবনীয় নয়। বেগম খালেদা জিয়াও চরম পর্যায়ের নির্যাতন সহ্য করেছেন। সহ্য করেছেন স্বামী-সন্তান হারানোর গভীর শোক আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা।
রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় অদম্য কণ্ঠস্বর খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে কয়েক দশকের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। জটিল আর অনিশ্চিত সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের হাল ধরেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।
তাঁর নেতৃত্বে ছিল প্রজ্ঞা আর অবিচল দৃঢ়তার মিশেল; তিনি কখনো কারোও কাছে নত করেননি, কোনো বাধায় পিছু হটেননি। এই আপসহীন মনোভাবই তাঁকে কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর। শত প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল থেকে আপসহীন পথচলাই বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ও দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে নামতে হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিংবা বারবার কারারুদ্ধ হয়েও তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। পাশপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ারও গৌবর অর্জন করেছিলেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য।
১৫ আগস্ট প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের জন্মদিনে শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।
একগুচ্ছ নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে সেই যাত্রার শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশের এক চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন এই চৌকস ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ফের দেশের হাল ধরেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতি গঠনে সচেষ্ট হন তিনি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদত বরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। এই ঘটনা দেশকে এক গভীর নেতৃত্ব সংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেই শূন্যতার মাঝেই রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অভিষেক ঘটে। বলা যায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনীতির এক অচেনা জগতে পা রেখেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী গৃহবধূ খালেদা জিয়া।
তিনি এমন এক সংকটময় সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, যখন দলটির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই যেন শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানেই ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদত বরণের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এমনকি তিনি বিএনপিকে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিএনপির দায়িত্ব নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল জনসভায় বেগম জিয়া প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হন, যা দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। একই বছরের ২৮ অক্টোবর তিনি দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল ‘বাংলাদেশ সচিবালয়’ ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। যদিও পুলিশ সেই আন্দোলন দমন করে। এই ঘটনার পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি রাজপথে সাত-দলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ ধর্মঘট, ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি, ‘গণপ্রতিরোধ দিবস’ এবং ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর মতো ধারাবাহিক কর্মসূচিতেও নেতৃত্বেও সারিতে ছিলেন এই মহিয়সী নেত্রী। ফলশ্রুতিতে ১৯৮৫ সালে বেগম জিয়াকে আবারও গৃহবন্দী করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত-দলীয় জোট এবং অন্য জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলনের মুখে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী পাঁচ-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আরও ছয়টি দল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। অপরদিকে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।
১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ সরকার তাঁকে ফের গৃহবন্দী করে। ব্যাপক কারচুপির ওই নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটের পর বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর আন্দোলনরত প্রধান তিন রাজনৈতিক জোটের সর্বসম্মত প্রস্তাব ও যৌথ রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের সরকার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। এতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সংসদ সংবিধান সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালের সরকারকে মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সময়কাল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এ সময় সরকার বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে। নারী শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তি উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়াত এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ক্ষমতার পালাবদল
১৯৯৬ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় নির্বাচিত হলেও তাদের মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগ রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বেগম জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বিজয়ী হলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করে সরকার পরিচালনা করেন।
সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে, যা ‘১/১১’ নামে পরিচিত। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করতে বাধ্য করে। পরবর্তী দুই বছর দেশ পরিচালনা করে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার।
এই সরকার বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠায়, তাঁর বড় ছেলে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লন্ডনে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসনে পাঠায়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড ও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ওই সময়ে বেগম জিয়াকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা এবং বিদেশে তাঁর কোনো দ্বিতীয় কোনো বাড়ি নেই।
এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চরম মাত্রার দমন-পীড়ন সহ্য করেন। কিন্তু কারও কাছে মাথা নত করেননি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথে আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলোর সংসদ বয়কটের মুখে তাঁর নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে।
কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর সংসদে তা বাতিল করে। অথচ এর আগে এই ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগই মরিয়া আন্দোলন করেছিল। বেগম জিয়া এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের চর্চা নষ্ট হয়েছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ বছরের সরকারের সময়ে বেগম জিয়া কঠোর দমন-পীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ছিল সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে।
বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হয়রানির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম হয়।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বড় জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানায় দেশের অগণিত জনগণ।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।