যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৬০ দিন বাড়াতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সমঝোতা
আপলোড সময় :
২৯-০৫-২০২৬ ১১:৪৪:০২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৯-০৫-২০২৬ ১১:৪৪:০২ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
বাংলা রিলিজ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়ানো এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে দুপক্ষ একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কাঠামোটি এখনও ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি চূড়ান্ত হলে কয়েক সপ্তাহের অচল কূটনীতির পর বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত এখনও স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। ৬০ দিনের এই মেয়াদ আলোচনা শেষ করার সময়সীমা কি না, তাও পরিষ্কার নয়। কারণ বর্তমান যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর রয়েছে।
উপসাগরে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলা
গত কয়েক দিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল। বৃহস্পতিবারও সীমিত পরিসরে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে উভয় পক্ষ। ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ইরানি ড্রোন অভিযান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর তেহরান কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার প্রথম এ প্রাথমিক সমঝোতার খবর প্রকাশ করে। পরে হোয়াইট হাউস আল জাজিরার কাছে ওই প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে।
খসড়া চুক্তিতে কী আছে
অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, ওই প্রস্তাব অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হবে এবং ইরানকে স্থগিত থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
চুক্তির লক্ষ্য হচ্ছে ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধপূর্ব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার করা এবং ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের আলোচনা শুরু করা।
আলোচনায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, নতুন সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত এবং জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তদারকির বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার অঙ্গীকার করবে।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে শান্তিচুক্তির খসড়া ইসরায়েলসহ মিত্র দেশগুলোর কাছে পাঠিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের অস্বীকৃতি ও পারমাণবিক ইস্যুতে অবস্থান
তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ‘আসন্ন চুক্তি’ সংক্রান্ত দাবিকে অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, ‘যদি সত্যিই চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়, তাহলে ইরান পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারী ও জনগণকে তা জানাবে। এর আগে পশ্চিমা সূত্রের যেকোনো বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়।
নৌপথ সংক্রান্ত সমঝোতার পাশাপাশি প্রস্তাবিত স্মারকে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতিও দিতে হবে বলে জানা গেছে। তবে তেহরান বহুবার প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র চায় না। যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ফরমান জারি করেছিলেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও বৃহস্পতিবার পুনর্ব্যক্ত করেন যে তার দেশ ‘পারমাণবিক অস্ত্রের সন্ধানে নেই’। ইরানের আইএসএনএ সংবাদ সংস্থার বরাতে তিনি বলেন, ‘আমরা অপমানজনক কূটনীতিতে জড়াই না।’
অমীমাংসিত ইস্যু ও ট্রাম্পের শর্ত
সম্ভাব্য চুক্তি হরমুজ ইস্যুর সমাধান আনতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখা এবং ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যতের মতো বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনায় নিষ্পত্তি করতে হবে।
ইরান বরাবরই বলছে, দেশটির অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতায় নিষিদ্ধ নয়। তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের পুরো পারমাণবিক কর্মসূচিই বন্ধ করতে হবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা চাইলেও তেহরান প্রতিরক্ষা নীতির বিষয়ে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, উভয় পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে এখনও কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ঠিক কবে বা আদৌ সমঝোতা স্মারকে সই করবেন কি না, তা বলা কঠিন। কয়েকটি ভাষাগত বিষয় নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
লেবানন ইস্যুতে জটিলতা
আরেকটি জটিল ইস্যু হচ্ছে লেবাননের যুদ্ধ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল সেখানে হামলা জোরদার করেছে, যাতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননের অন্তত দুটি বড় শহরের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো বৈরুতে হামলা চালায় ইসরায়েল। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটি লেবাননের রাজধানীতে দ্বিতীয় হামলা।
ইরান আগেই জানিয়েছিল, যে কোনো যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বর্তমান চুক্তির কাঠামো ইসরায়েলের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ এতে ইরানকে তাৎক্ষণিক কঠোর পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করা হয়নি এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবাননের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ও ওমানকে ঘিরে উত্তেজনা
তেহরানের প্রস্তাবনায় ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বেশি স্পষ্ট থাকলেও ট্রাম্পের খসড়ায় তা তুলনামূলক অস্পষ্ট। তবে এতে হরমুজ প্রণালিতে টোলমুক্ত নৌযাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ওমানের সঙ্গে আলাদা একটি চুক্তির চেষ্টা করছে ইরান, যার আওতায় ‘নৌ-পরিচালনা সেবা’ বাবদ ফি আরোপ করা হতে পারে।
এ বিষয়ে বিরত থাকতে বুধবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এমন চুক্তি হলে তিনি ওমানকে ‘ধ্বংস করে দেবেন’। তবে মাসকাট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
মস্কোয় ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী বাঘেরি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, কোনো শর্ত ছাড়াই স্থগিত সম্পদ ইরানের ব্যাংক হিসাবে ফেরত দিতে হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নবগঠিত ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সংস্থাটি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল তদারকির জন্য গঠন করা হয়েছে। তেহরান এ বিষয়ে ওমানের সমন্বয় চেয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে টোল ব্যবস্থা কার্যকর করতে সহায়তা করলে ওমানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট অন্য দেশগুলোকেও একই ধরনের পদক্ষেপের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ চাপ
এদিকে, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে ইরানের ভেতরে বিতর্ক বাড়তে থাকায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি কর্মকর্তাদের মতপার্থক্যকে বিভাজনে রূপ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বর্তমানে বন্ধ থাকা পার্লামেন্টকে জনগণের অর্থনৈতিক উদ্বেগ মোকাবিলার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে বলেছেন।
খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ‘হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য’ করতে চায়। তিনি বলেন, ‘শত্রুর অন্ধ পরিকল্পনা হচ্ছে, সামরিক ব্যর্থতা ঢাকতে বিভাজন ও ধ্বংস সৃষ্টি করা।
ট্রাম্পের বুধবারের হুমকিতে ওমানের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের স্থানীয় সময় শুক্রবার ওয়াশিংটনে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকেই অবশ্য এ চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প জানিয়েছেন যে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে তার আরও কয়েকদিন সময় প্রয়োজন।
এরই মধ্যে যেকোনো চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের আওতায় আনার পক্ষে চাপ দিয়ে যাচ্ছে চীন।
এদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে দেশটিতে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা রয়েছেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Bangla Release 24
কমেন্ট বক্স