ঢাকা , সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ , ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে অন্যকে হেনস্তা করে, সেই মানুষটি তার চেয়ে বেশি আলোচিত!

আপলোড সময় : ২০-০৪-২০২৬ ০১:২৬:৪৭ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ২০-০৪-২০২৬ ০১:২৬:৪৭ পূর্বাহ্ন
যে অন্যকে হেনস্তা করে, সেই মানুষটি তার চেয়ে বেশি আলোচিত! ওবায়েদ উল্যাহ ভূলন

ওবায়েদ উল্যাহ ভূলন:   আপনি কি ছোটবেলায় কখনো অন্যদের দ্বারা ভয় দেখানো বা হেনস্তার শিকার হয়েছেন? স্কুলের মাঠে কিংবা টিফিনের বিরতিতে কেউ কি আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা করত, একা করে দিত, অপমান করত? তাহলে আপনি মোটেও সাধারণ ছিলেন না। যাকে কেউ বিরক্ত করে না, সে আসলে একেবারেই নজরে পড়ার মতো নয়।
যে মানুষটি অন্যকে হেনস্তা করে, সে আসলে সেই মানুষটিকেই বেছে নেয়, যে কোনো না কোনোভাবে তার চেয়ে বেশি আলোচিত, বেশি মনোযোগ আকর্ষণকারী। বুলি বা হেনস্তাকারী আসলে চায় সেই আলোটাকে নিভিয়ে দিতে, নিজের হীনমন্যতাকে আড়াল করতে।
ইউনিসেফের ২০২৩ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, সারা পৃথিবীতে প্রতি তিনজন স্কুলপড়ুয়ার মধ্যে একজন কোনো না কোনোভাবে বুলিং বা হেনস্তার শিকার হয়। বাংলাদেশও এই পরিসংখ্যানের বাইরে নয়—মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ২০২২ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী শৈশবে মানসিক বা শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।
বুলিং কেন হয়? মনোবিজ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর অনেক আগেই দিয়েছে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) গবেষণা বলছে, যে ব্যক্তি অন্যকে হেয় করে, ভয় দেখায় বা সামাজিকভাবে একা করে দেয়, সে আসলে নিজের ভেতরের গভীর অনিরাপত্তাকে ঢাকতে চায়।
সে চায় নিজেকে ক্ষমতাশালী প্রমাণ করতে, অন্যদের চোখে বড় দেখাতে। কিন্তু এই 'বড়ত্ব' ক্ষণস্থায়ী। গবেষণা দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে বুলিং উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর শিকার; যেমন আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিরতা হারায়, তেমনি হেনস্তাকারীও পরিণত বয়সে গভীর সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়, একাকিত্বে ভোগে। এই সত্যটা ব্যক্তিজীবনে যেমন প্রযোজ্য, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও ঠিক ততটাই সত্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বারো বছর বয়সের স্কুলমাঠে যা ‘কাজ করে’, তা কি একটি পরাশক্তির বৈদেশিক নীতিতেও কাজ করে? 
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা এই কৌশলকে ‘কোয়ার্সিভ ডিপ্লোমেসি’ বা জোরজবরদস্তির কূটনীতি বলে থাকেন। 
ইরানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ট্রাম্পের পারমাণবিক হুমকির পর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল বটে, কিন্তু তা স্থায়িত্ব পায়নি। ইসরায়েল লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখায় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা না কমায় সেই যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী সক্রিয় সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা এখন ৫৬টি; যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ২.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। হুমকি-ধমকির কূটনীতি শান্তি আনেনি, উল্টো বিশ্বকে আরও অস্ত্রের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই অস্থির পরিবেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কথা আলাদাভাবে ভাবতে হবে। আমরা বাংলাদেশে বসে এই বৈশ্বিক ধমকের রাজনীতিকে নিছক দূরের ঘটনা মনে করলে ভুল হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির আক্রমণাত্মক পরিবর্তন, শুল্ক আরোপের হুমকি ও ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের ব্যবহার; এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের রফতানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ ও মুদ্রার স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। বিজিএমইএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় ১৮ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে, যা আর্থিক মূল্যে প্রায় ৭-৮ বিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটনের প্রতিটি আক্রমণাত্মক বাণিজ্য সিদ্ধান্ত তাই ঢাকার কারখানাপাড়াতেও ঢেউ তোলে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবনমানে সরাসরি আঘাত করে।
হয়তো সাময়িকভাবে ভয় দেখিয়ে কিছু আদায় করা যায়। একটা ঘোষণা, একটা ছাড়, একটু মনোযোগ, কিছুদিনের জন্য শিরোনাম। কিন্তু তারপর? আচরণ অর্থনীতির গবেষক ড্যান অ্যারিয়েলি তাঁর বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন, ভয় বা জোর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ বা রাষ্ট্র যখনই সুযোগ পায়, সেই ভয়ের শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে, বরং আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। চীন ও রাশিয়া এখন বিকল্প বৈশ্বিক কাঠামো গড়তে আগ্রহী; বিআরআইসিএস’র সম্প্রসারণ, বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার আলোচনা, নতুন বাণিজ্য জোট; এসব কি মার্কিন বুলিংয়ের প্রত্যক্ষ পরিণতি নয়? ক্ষমতার ধমক কি আসলে বিশ্বকে আরও বিভক্ত করছে না?
 ‘পারফরমেটিভ অথরিটি’ যেখানে ক্ষমতা প্রদর্শনটাই মূল আকর্ষণ, প্রকৃত সমস্যা সমাধান নয়।
ট্রাম্পও সেই একই দর্শনে বিশ্বাসী, আর তার সমর্থকরা মনে করেন আক্রমণাত্মক কৌশলই সমস্যার সমাধান। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গ্যালন প্রতি এখনও চার ডলারের বেশি, মূল্যস্ফীতি সামলাতে মধ্যবিত্ত আমেরিকান হিমশিম খাচ্ছে, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতার সূচক ক্রমশ নিম্নমুখী।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৪ সালের গ্লোবাল অ্যাটিটিউডস সার্ভে জানাচ্ছে, জরিপ করা ৩৪টি দেশের মধ্যে ২৭টিতেই যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষত পশ্চিম ইউরোপ, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোয় ট্রাম্পের নীতির প্রতি আস্থা ঐতিহাসিক নিম্নে পৌঁছেছে। ফ্রান্সে বাস করে আমি নিজে প্রতিদিন দেখছি, ইউরোপীয় নাগরিকরা কীভাবে মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি ক্রমবর্ধমান সংশয়ী হয়ে উঠছেন। এটি কি একটি সফল পরাশক্তির নিদর্শন? যে দেশ একদিন ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পুরোধা ছিল, সে কি ধমক দিয়ে সেই সম্মান ফিরে পাবে?
মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধমকের রাজনীতি আরও ভয়ানক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ২০২৪ সালের বিশ্ব প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসী আচরণ দুর্বল দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে উৎসাহিত করে।
কারণ যখন সবচেয়ে ক্ষমতাশালী গণতন্ত্র নিজেই আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখায়, তখন ছোট স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোও সেই উদাহরণ অনুসরণ করার সাহস পায়। ডেমোক্রেসি উইদাউট বর্ডার্সের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, ২০২৩-২৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের হার বেড়েছে। এই সামগ্রিক পরিবেশে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন।
আমাদের সন্তানদের আমরা কী শেখাচ্ছি, এই প্রশ্নটি এখানে অপ্রাসঙ্গিক নয়। পৃথিবী কখনো কখনো সেই একাকী, কষ্টে থাকা মানুষটাকেই পুরস্কৃত করে যদি সে যথেষ্ট জোরে চিৎকার করতে পারে এবং যথেষ্ট বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে ধমক দিতে পারে। এই সত্য থেকে চোখ ফেরালে চলবে না, কিন্তু এটাকে আদর্শ হিসেবে মেনে নেওয়াও চলবে না। আমাদের প্রজন্মকে শেখাতে হবে, প্রকৃত শক্তি আসে বিশ্বাসযোগ্যতা থেকে। ভয় থেকে নয়।
ইতিহাস কিন্তু বারবার প্রমাণ করেছে, ভয় দিয়ে অর্জিত ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। বাংলাদেশ নিজেই এর সবচেয়ে বড় জীবন্ত সাক্ষী। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা ভেবেছিল সশস্ত্র শক্তি ও নিষ্ঠুর দমনপীড়ন দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে চিরতরে পদানত রাখা যাবে। লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা ইতিহাস তাদের সেই ভ্রান্ত বিশ্বাস চূর্ণ করেছে। বিশ্বইতিহাসে এই উদাহরণ একা নয়। নাৎসি জার্মানি, সোভিয়েত স্তালিনবাদ, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী শাসন, প্রতিটি ধমকের সাম্রাজ্য শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সেই একই নিয়ম প্রযোজ্য। ধমক দিয়ে হয়তো কিছুদিনের জন্য আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু মর্যাদা, বিশ্বাস ও টেকসই অংশীদারিত্ব অর্জন করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত বুলিং একটি ফাঁপা বিজয়। স্কুলমাঠের বুলি হয়তো কিছুক্ষণের জন্য বুক ফুলিয়ে হাঁটে, কিন্তু তার ভেতরটা থাকে ফাঁকা, তার চারপাশ থাকে সম্পর্কহীন। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্ট যখন সেই একই পথে হাঁটেন, তখন শুধু তাঁর দেশই নয়। আমরা সবাই প্রতিদিন, একটু একটু করে একটি কম নিরাপদ, কম বিশ্বাসযোগ্য পৃথিবীতে বাস করি।
মানুষের ক্ষতি করে যারা পৈশাচিক আনন্দ পান, আসলেই কি তারা দিন শেষে সুখের দেখা পায়?


নিউজটি আপডেট করেছেন : Bangla Release 24

কমেন্ট বক্স

প্রতিবেদকের তথ্য

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ