এমপিদের গাড়ি বিলাস,জাতির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বেতন নিজে ঠিক করা অস্বস্তিকর!
আপলোড সময় :
২৩-০৪-২০২৬ ০৭:২৮:১৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৩-০৪-২০২৬ ০৭:২৮:১৩ অপরাহ্ন
ডা.তাসনিম জারা
ডা.তাসনিম জারা: সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এনসিপি নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপিদের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির দাবি জানিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ ধরনের দাবি উঠায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। বিষয়টিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবেক এনসিপি নেত্রী ডা. তাসনিম জারা।
যখন শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স ও সরকারি কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধি ও ন্যায্য দাবির জন্য রাজপথে দিনের পর দিন আন্দোলন করছেন, তখন এমপিরা সংসদে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যস্ত।
জনগণের মৌলিক সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেলেও এমপিদের গাড়ি বা অফিসের দাবির প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দল মুহূর্তের মধ্যে একমত হয়ে যায়।
জারা উল্লেখ করেন, পৃথিবীর কোনো পেশার মানুষ নিজের বেতন বা সুযোগ-সুবিধা নিজে নির্ধারণ করে না। এমপিদের বেতন জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে আসে, তাই এটি তারা নিজেরা নির্ধারণ করা নীতিগতভাবে ভুল। তার মতে, এমপিরা জনগণের সেবক। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় জনগণের সমস্যার চেয়ে এমপিদের নিজস্ব প্রাপ্তির হিসাবই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এমপিরা সংসদে গিয়েছেন জনগণের সমস্যার সমাধান করতে, নিজেদের প্রাপ্তির হিসাব কষতে না। যখন একজন শিক্ষক ছয় মাস আন্দোলন করেও সাড়া পান না, কিন্তু এমপিদের সুবিধার সিদ্ধান্ত কয়েক দিনেই হয়ে যায়, তখন পরিষ্কার হয়ে যায় এই ব্যবস্থায় আসলে কার স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ।
এমপিদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণের জন্য একটি নিরপেক্ষ কাঠামো থাকা প্রয়োজন। জনসেবার দোহাই দিয়ে জনগণের করের টাকায় নিজেদের বিলাসিতা নিশ্চিত করাকে অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য।
এর সমাধান, একটা স্বাধীন কমিটি গঠন করুন, যারা এমপিদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করবে।
এই কমিটি কী করবে? প্রথমত, অন্যান্য পেশার সাথে তুলনা করে দেখবে। একজন এমপির দায়িত্ব কী, সময় কতটুকু দিতে হয়, ঝুঁকি কেমন, যোগ্যতা কী লাগে। এগুলো বিবেচনা করে দেখবে তার প্রাপ্য আসলে কতটুকু হওয়া উচিত। একজন জেলা জজ, একজন সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন হাসপাতালের কনসালট্যান্ট। এদের সাথে তুলনা করে একটা যৌক্তিক অবস্থান বের করা সম্ভব।
কমিটি দেখবে সুযোগ-সুবিধাগুলো আজকের বাস্তবতায় প্রাসঙ্গিক কিনা। অনেক ভাতা বা সুবিধা হয়তো কোনো এক সময়ে যুক্তিসঙ্গত ছিল, কিন্তু আজকের দিনে তার আর কোনো ভিত্তি নেই। আবার কিছু নতুন চাহিদা হয়তো তৈরি হয়েছে, যেগুলো এখনো স্বীকৃত হয়নি।
এই কমিটির কাজ শুধু সুধিবা বাড়ানো বা শুধু সুবিধা কাটছাঁট করা না। হতে পারে কিছু ক্ষেত্রে এমপিদের প্রাপ্যতা আসলেই অপ্রতুল। একজন প্রত্যন্ত এলাকার এমপিকে যে পরিমাণ যাতায়াত করতে হয়, যে পরিমাণ মানুষের সাথে দেখা করতে হয়, সেই হিসেবে তার সহায়তা তহবিল বা অফিস সুবিধা হয়তো বাড়ানো দরকার।
আবার কিছু সুবিধা, যেমন শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি, হয়তো আজকের দিনে যৌক্তিকতা হারিয়েছে। সেগুলো ছাঁটাই হোক। মোদ্দা কথা, কোনটা বাড়বে কোনটা কমবে, সেটা নিরপেক্ষ বিচারে ঠিক হোক। এমপিরা নিজেরা এই সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেবে স্বাধীন কমিটি।
এই কমিটিতে কারা থাকবেন সেটা আলাদা আলোচনার বিষয়, এবং সেই আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে মূল নীতি হচ্ছে বিচারক, অর্থনীতিবিদ, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ, সুশাসন সংস্থার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও থাকতে হবে। একজন সরকারি স্কুলশিক্ষক, একজন নার্স, একজন ছোট ব্যবসায়ী থাকতে পারেন। কারণ এমপিদের সুযোগ-সুবিধা শেষ পর্যন্ত একটা অনুপাতের প্রশ্ন। সাধারণ বাংলাদেশির জীবনমানের সাথে তাঁদের প্রাপ্যতার অনুপাত। সেই অনুপাত বোঝার জন্য ঘরে এমন মানুষ দরকার, যারা সেই জীবনটা যাপন করেন।
এমপিদের নিজেদেরই এই প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান, এটা আপনাদের মর্যাদার প্রশ্ন। জাতির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বেতন নিজে ঠিক করা একটা অস্বস্তিকর বিষয়। যেটা থেকে বের হয়ে আসা আপনাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Bangla Release 24
কমেন্ট বক্স