নভেম্বরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ : সিইসি
আপলোড সময় :
২৮-১০-২০২৬ ০৪:৩৮:৩৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৮-১০-২০২৬ ০৪:৩৮:৩৫ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
আহমদ আনছারী, নিজস্ব প্রতিনিধি: স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বলেন সিইসি।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থীদের পেছনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে পারে। এ কারণে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সিইসি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা খুবই দরকার। এজন্য আমরা তাদের সঙ্গে বসার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই নভেম্বর মাসের মধ্যেই তাদের সঙ্গে বসব আমরা।’
তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে এবং পূর্ণমাত্রায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচনে জালিয়াতি হলে তা প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
ইউপি নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা, কঠোর হবে আচরণবিধি
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন সিইসি। ভোটকেন্দ্র, ভোটার তালিকা, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রয়েছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময় রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, আইনগতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আদালতের নির্দেশনার আওতায় থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ইউপি নির্বাচনে সহিংসতাকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। এ কারণে আচরণবিধি বাস্তবায়নে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত করা ক্যামেরাও থাকবে। এতে নির্বাচনে সহিংসতা বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলে তা রেকর্ডে থাকবে।
সিইসি বলেন, ‘আচরণবিধি আমরা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। এ ব্যাপারে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে কমিশনের প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান সিইসি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুত মূল্যায়নে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশন এবং সামগ্রিক নির্বাচনব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
সিইসি বলেন, মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা, নির্বাচন কমিশনকে আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে কমিশন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ লক্ষ্য অর্জনে ভোটার তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ ও তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
তিনি জানান, এ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
সিইসি বলেন, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা মানুষের আস্থা ফেরানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
স্বচ্ছতা ও অংশীজনদের সহযোগিতায় গুরুত্ব
ভবিষ্যতে ভালো নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মানুষের আস্থা ধরে রাখা, প্রতিটি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সব অংশীজনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন সিইসি।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপ এমন হতে হবে, যাতে মানুষ নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায় এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা গোপনীয়তার সুযোগ না থাকে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সবার সহযোগিতা কমিশনকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করেছে। ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এই সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।
সাংবাদিকদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সুযোগ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, সাংবাদিকদের জন্য কমিশনের দরজা উন্মুক্ত। তারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।
জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র কমিশন থেকে দেওয়া হবে। স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রেস ক্লাবের সাথে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
তিনি বলেন, কমিশন সব সময় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চায় এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে সাংবাদিকদের কার্যকর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করে।
অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ ব্যবস্থা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা কার্যকর রাখার কথা জানান সিইসি।
তিনি বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিকার যেন স্থানীয় পর্যায়েই দ্রুত পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় কমিশন।
কালো টাকা ব্যবহার ও ভোট কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, এসব অনিয়মের খবর পাওয়া গেলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংবাদপড়ুন
সিইসি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। সব অংশীজন নিয়ম মেনে নির্বাচনী মাঠে থাকলে কমিশনের জন্য অনিয়ম প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
১০ মাস থেকে এক বছরে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন
ইতিহাস ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সিইসি।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণ করেন। নির্বাচন না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া উপজেলা পরিষদসহ কয়েকটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও কার্যক্রমের সাথে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা প্রয়োজন হয়। এ কারণেও ইউপি নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সিইসি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরপরই পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিভিন্ন পরীক্ষা, বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষা এবং বর্ষা মৌসুমের সম্ভাব্য বন্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী থাকবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানোকে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সিইসি।
তিনি বলেন, নারী ভোটার পাওয়া গেলেও প্রার্থী হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা তুলনামূলক কঠিন। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নিরুৎসাহিত করা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানিমূলক প্রচারণা নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
সিইসি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য আইনে রাখা হয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
তরুণ ভোটারদের জন্য বিশেষ সুযোগ
তরুণদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে ভোটার হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানান সিইসি। তিনি বলেন, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তারা ভোটার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আগে বছরের ১ জানুয়ারিকে ভিত্তি ধরে বয়স গণনা করা হলেও এবার নতুন সুযোগের ফলে আরও বেশি তরুণ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।
তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সব পক্ষের সহযোগিতায় সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করতে সব অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করেন সিইসি।
তিনি বলেন, নির্বাচনে সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন অনিয়ম ও সহিংসতা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে। একইসাথে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও ভোটারদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে কমিশন।
সিইসি বলেন, কমিশন নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ও মানসম্মত স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Bangla Release 24
কমেন্ট বক্স